২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব সংশোধন করে চূড়ান্ত দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। চূড়ান্ত হিসাবে সাময়িক হিসাব থেকে বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে। চূড়ান্ত হিসাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার তলানিতে নেমেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ে ভাটা দেখা দিয়েছে। প্রবৃদ্ধির গতি কমে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা করোনা-পরবর্তী দুর্বল সময়ের সঙ্গে তুলনীয়। টানা কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধির এই পতন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবিএসের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, তার আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির গতি কমছে।

বিবিএস দেশের জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের পরিসংখ্যান প্রণয়ন ও প্রকাশ করে। আগেই প্রাপ্ত সাময়িক তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপির প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করে সেই হিসাব সংশোধন করেই এবারের চূড়ান্ত জিডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। সর্বশেষ এত কম প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০১৯-২০ অর্থবছরে, যখন করোনা মহামারির প্রভাবে প্রবৃদ্ধি নেমে গিয়েছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে।

প্রবৃদ্ধির হার কমলেও অর্থনীতির আকার বেড়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপির আকার ধরা হয়েছিল ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। চূড়ান্ত হিসাবে সেখান থেকে প্রায় ৩৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা কমিয়ে জিডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। ডলার হিসাবে এই জিডিপি ৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে চূড়ান্ত জিডিপির আকার ছিল ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জিডিপির আকার বেড়েছে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকার হিসাবে জিডিপির আকার বেড়েছে প্রায় ৫ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, টানা দুই বছর হ্রাসের পর মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার। টাকার হিসাবে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩০ হাজার ৪০৯ টাকা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এই আয়ের বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে তেমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াই সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি পতনের বড় কারণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৩০ শতাংশের তুলনায় ০ দশমিক ৮৮ শতাংশ পয়েন্ট কম।

শিল্প খাতে তুলনামূলকভাবে সামান্য ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। চূড়ান্ত হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ০ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তবে এই উন্নতি কৃষি ও সেবা খাতের ধীরগতি পুষিয়ে দিতে পারেনি।

সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি আরও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে, যেখানে আগের অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে ০ দশমিক ৭৪ শতাংশ পয়েন্ট।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগ নেমে এসেছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। একই সময়ে দেশজ সঞ্চয় কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশে এবং জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত নেমে এসেছে ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের এই নিম্নমুখী প্রবণতাই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরগতির মূল কারণ। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে আগামী দিনগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি আরও চাপে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন তারা। সব মিলিয়ে সাময়িক হিসাবের কাটছাঁট, কমে আসা প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ-সঞ্চয়ের ভাটা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত জিডিপি হিসাবকে শুধু সংখ্যার নয়, নীতিনির্ধারকদের জন্যও বড় এক সতর্কবার্তায় পরিণত করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here